বিশেষ সংবাদদাতা
প্রিন্ট
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ১:৪৬ অপরাহ্ণ
লিগ্যাল অফিসার ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। ছবি-সংগ্রহ।
বিশেষ সংবাদদাতা
ব্যারিস্টার জাইমা রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির সচিবালয়ে লিগ্যাল অফিসার (আইন কর্মকর্তা) হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। বিভিন্ন দফতরে মোট ৪০ জনের মধ্যে বাংলাদেশী হচ্ছেন ৬ জন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি (বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত) খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে জাইমা রহমান এই দায়িত্ব পেয়েছেন বলে ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এ সংবাদদাতাকে জানিয়েছেন। একইসাথে একই সচিবালয়ের উপ-প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশী ক’টনীতিক ড. আব্দুল আলিম এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দেশগুলোর বিষয় সংক্রান্ত সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে মো. রফিকুল আলম মোল্লা। এই তিনজনই খলিলুর রহমানের মেয়াদ (এক বছর) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা আরো জানিয়েছেন, ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের বেতন, ভাতা, বাসা ভাড়া, ড্রাইভারসহ গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে বাংলাদেশকে। নিত্য প্রয়োজনীয় খাবারের খরচও বহন করবে বাংলাদেশ। জাইমা রহমান জাতিসংঘ থেকে কোন সুযোগ-সুবিধাই পাবেন না। ইউএনজিএ প্রেসিডেন্ট খলিলুর রহমানের নিউইয়র্কে থাকা, খাওয়া, গাড়িসহ ড্রাইভারের ব্যয়ভারও বহন করতে হবে বাংলাদেশকেই। তবে আব্দুল আলিম এবং রফিকুল আলম মোল্লার বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দেবে জাতিসংঘ। পিজিএ’র অন্য দফতরে দায়িত্ব পাওয়া ৩ জন হলেন উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক সহকারি মোয়াজ্জেম হোসেন, সিনিয়র এডভাইজার মফিজুল ইসলাম এবং জাকির আহমেদ। তারাও বাংলাদেশ সরকার থেকে বেতন-ভাতা-থাকা-খাওয়ার সুবিধা পাবেন কিনা তা এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পিজিএ সচিবালয়ের উপ-প্রধান আব্দুল আলিম। ছবি-সংগ্রহ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির সচিবালয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পদে বাংলাদেশী নিযুক্ত হবার সংবাদে প্রবাসীরা উল্লাস প্রকাশ করলেও সভাপতি খলিলুর রহমান ও আইন কর্মকর্তা জাইমা রহমানের বিশাল ব্যয়-ভার বাংলাদেশকেই বহন করার সংবাদে কিছুটা হতাশাও তৈরী হয়েছে।
জাতিসংঘ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জাইমা রহমান একজন পেশাদার ব্যারিস্টার এবং আইন ও নীতি বিশেষজ্ঞ। তিনি যুক্তরাজ্যের ‘কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’ থেকে আইন ও রাজনীতিতে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ‘ইনার টেম্পল’ থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল সম্পন্ন করেন। জাইমা রহমান যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশ উভয় দেশেই আবাসন, কল্যাণ ও শ্রম আইন, স্বাস্থ্য খাত এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে আইনি পরামর্শক ও গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন।
উল্লেখ্য, জাইমা রহমান বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং ডা. জোবাইদা রহমানের একমাত্র কন্যা। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি।
জাতিসংঘের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সচিবালয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে আইনি বিষয়গুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করছেন।
অপরদিকে, ঢাকার তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র ড. আব্দুল আলীম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উপ-প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাবার আগে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের চৌকষ ক’টনীতিক হিসেবে বিভিন্ন দেশের মিশনে চাকরি করেছেন। ১৮তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় সার্বিকভাবে ১ম স্থান অধিকারী ড. আলিম আন্তর্জাতিক প্রশাসন ও সিভিল সার্ভিসে একটি বিশিষ্ট ক্যারিয়ার গড়েছেন। তার নিয়োগ বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশি কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সুধীজনের কাছে। একইভাবে মো. রফিকুল আলম মোল্লাও একজন পেশাদার কূটনীতিক।
সিনিয়র অ্যাডভাইজার মো. রফিকুল আলম মোল্লা। ছবি-সংগ্রহ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির নীতি-নির্ধারণী ফোরামে তারা সভাপতি খলিলুর রহমানের বৈশ্বিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বিদ্যমান রীতির উদ্ধৃতি দিয়ে এ সংবাদদাতাকে জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের মূল কোনো স্টাফ নন এবং সংস্থাটি থেকে তিনি সরাসরি কোনো নিয়মিত বেতন পান না। সাধারণ পরিষদের সভাপতির বেতন-ভাতা, আবাসন বা বাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন খরচ সাধারণত তার নিজের দেশ বা নিজ সরকার বহন করে থাকে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট ও স্বেচ্ছামূলক ট্রাস্ট ফান্ড থেকেও এর ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
এজন্যে, ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর জন্য বাড়ি ভাড়াসহ প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রস্তাব বা চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ চিঠিতে বাড়ি ভাড়া বাবদ মাসিক ১৫ হাজার ডলার হিসেবে বার্ষিক ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার ব্যয় হবে। যা বাংলাদেশি টাকায় মোট ২ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার টাকার সমান। সম্প্রতি এই অর্থ বাজেট বরাদ্দ হিসেবে চেয়ে অর্থ সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। চিঠিতে কোন খাতে কত টাকা প্রয়োজন তার একটি বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কার্যালয়ের সভাপতি পদের কাজ শুরু করেছেন ৮ সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক অর্জন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জানা গেছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি একটি অবৈতনিক পদ। এ পদের মর্যাদা, সাধারণ পরিষদের কার্যাবলীসহ অন্যান্য কূটনৈতিক কার্যাবলী সূচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য সভাপতির বেতন-ভাতা, আবাসন ও যানবাহনের ব্যবস্থা ঐতিহ্যগতভাবেই মনোনয়ন প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে বহন করতে হয়। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত জাতিসংঘের ৪১ তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় বাংলাদেশ সরকারই বহন করেছিল।
এ কারণে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি অর্থাৎ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়ের বাজেটে এ অর্থ বরাদ্দ করা প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র সচিব।
জানা গেছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ এবং সেখানে থাকা-খাওয়ার (ভ্রমণ ও আনুষঙ্গিক) ব্যয় মূলত তিনটি প্রধান উৎস থেকে মেটানো হয়। এর একটি হচ্ছে অফিস অব পিজিএ ট্রাস্ট ফান্ড : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়কে সহায়তার জন্য একটি বিশেষ ট্রাস্ট ফান্ড বা স্বেচ্ছামূলক তহবিল রয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, বিভিন্ন সংস্থা বা অংশীদাররা এই তহবিলে স্বেচ্ছায় অর্থ প্রদান করে। প্রেসিডেন্টের আন্তর্জাতিক সফর, প্রচারণামূলক কাজ এবং বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনার খরচের একটি বড় অংশ এই ট্রাস্ট ফান্ড থেকে বহন করা হয়।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমন্ত্রণকারী বা স্বাগতিক দেশ: প্রেসিডেন্ট যখন নির্দিষ্ট কোনো দেশে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা সরকারি সফরে যান, তখন অনেক সময়ই সেই স্বাগতিক দেশ বা সংশ্লিষ্ট সরকার তাঁর থাকা-খাওয়া, স্থানীয় যাতায়াত ও আতিথেয়তার সম্পূর্ণ বা আংশিক ব্যয় বহন করে। এছাড়া সভাপতির নিজ দেশের সরকার: প্রেসিডেন্টের মূল আবাসন ও অন্যান্য খাতের মতো তাঁর সফরের বহর বা বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত খরচের জোগান তাঁর নিজের দেশের সরকারও দিয়ে থাকে।
জাতিসংঘের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নীতির অংশ হিসেবে সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট তাঁর প্রতিটি অফিশিয়াল সফরের খরচ কোন উৎস (যেমন- ট্রাস্ট ফান্ড নাকি স্বাগতিক দেশ) থেকে সরবরাহ করা হয়েছে, তা জাতিসংঘের অফিসিয়াল ট্র্যাভেলস পোর্টালে জনসমক্ষে প্রকাশ করে থাকেন।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য, গত ২ জুন জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে পরাজিত করে এই ঐতিহাসিক জয় লাভ করেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি ৯৯টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সাইপ্রাসের প্রার্থী পান ৯১ ভোট।
Posted ১:৪৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর